দক্ষিণ সুনামগঞ্জ দুধের গ্রামে কমে যাচ্ছে দুধ বিক্রেতা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকাতার দাবী, কমে গেছে গো-চারণ ভূমি, ভিন্ন পেশায় গোয়ালরা

ল্প

আলাল হোসেন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ (সুনামগঞ্জ):
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দরগাপাশা ইউনিয়নে দুধের গ্রাম হিসেবে খ্যাত ইসলামপুরে দিন দিন কমে যাচ্ছে দুধ বিক্রেতার সংখ্যা। দুধের ব্যবসা ছেড়ে অধিকাংশই এখন অন্যান্য পেশার দিকে ঝোকছেন। বেশিরভাগ মানুষ এখন কৃষি আর মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। কেউ কেউ পাড়ি দিচ্ছেন প্রবাসেও। তাই, দুধ ব্যবসায় এই গ্রামের অতীত জৌলুস এখন বিলুপ্তির পথে। অথচ মাত্র এক দশক আগেও এই গ্রামের গরু থেকে উৎপন্ন খাটি দুধেই চাহিদা মিটতো উপজেলার প্রতিটি গ্রামের দুধ পিয়াসী মানুষের। দুধ ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন গরু থেকে দুধ দোহন করে কলসিতে করে পায়ে হেঁটে উপজেলার পাগলা বাজার, পশ্চিম পাড়া, বীরগাঁও, শান্তিগঞ্জ, আক্তাপাড়াসহ বেশ কয়েকটি স্থানে দুধ সরবরাহ্ করতেন। এখনও যারা এই ব্যবসায় জড়িত আছেন তারাও একই কায়দায় দুধ বিক্রি করে থাকেন। মাত্র এক দশক আগে এই গ্রামে ১৫ থেকে ২০ জন দুধ পেশাদার দুধ ব্যবসায়ী থাকলেও এখন আছেন ৫ থেকে ৬ জন। আশংকা জনক হারে কমে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় এই পেশার লোক। এই গ্রামের ব্যবসায়ীর কাছে গরুর খাঁটি দুধ কিনতে পাওয়া যায় বলে সাধারণ মানুষ তাদের কাছ থেকে দুধ কিনতে বেশি আগ্রহ দেখান। কিন্তু বিক্রেতারা পর্যাপ্ত পরিমান দুধ সরবাহ্ করতে পারেন না। কারণ আগের তুলনায় গরু এখন একেবারে কম দুধ দেয়। গরু দুধ কম দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে এই গ্রামের প্রবীণ লোকেরা জানান, আগের তুলনায় গো-চরণ ভূমি একেবারে কমে গেছে। গরুর ঘাস নাই। মূল ধনের অভাবে পুষ্টিকর খাবার না খাওয়ানোসহ নানাবিদ কারণে গরু দুধ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। গোয়ালরা দাবী করেন, সরকার যদি পৃষ্টপোষকতা করেন তাহলে গাভী পালনে উৎসাহিত হবেন তারা। দুধ ব্যবসার ঐতিহ্য ফিরে আসতে পারে। এ অঞ্চলের দুধের চাহিদা মিটতে পারে এখান থেকেই।
ইসলামপুর গ্রামের প্রবীণ মুরব্বিরা জানান, আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে দাইমুল্লাহ্, আবদুল করিম মুন্সি, সাহেব আলী, আবদুল আজিজ, চেরাগ আলী, সুরুজ আলী, চাঁন্দ আলী, আফছর উদ্দিন, তাব উদ্দিন, লহিন্দর, লহিমুদ্দিসহ প্রায় ২০ জন পূর্ব পুরুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এখানে এসে বসতি স্থাপণ করেন। কৃষির পাশাপাশি তারা দুধ বিক্রিও করতেন। তাদের ছেলেরাও এই ব্যবসা করতো। এরই ধারাহিকতায় চতুর্থ প্রজন্মের তারাও এই ব্যবসা করছেন। বর্তমানে এই গ্রামে মুসা মিয়া, মনসুর আলী, ফারুক মিয়া, আবদুল কুদ্দুছ, ময়না মিয়ারা এই ব্যবসায় বাণিজ্য করে কোনো ওশমেই ঠিখে আছেন। এখন যদিও গ্রামের ৫ থেকে ৬ জন এ ব্যবসা করেন তবে- প্রত্যেকের পূর্ব পুরুষেরা প্রত্যোক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ব্যবসার সাথেই জড়িত ছিলেন। বর্তমানে কৃষি আর মাছ ব্যবসায়ই এই গ্রামের লোকেদের প্রধান জীবিকা।
সোমবার দুপুরে ইসলামপুর গ্রামে গিয়ে গ্রামের একাধিক মুরব্বিদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এই গ্রামের জন্ম প্রায় ১ শ ৭৫ বছর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে এখানে একসাথে এসে ২০টি পরিবার বসতি স্থাপন করেন। কৃষি তাদের আদি পেশা। সেই সাথে গরু লালন পালনও করতেন তারা। প্রচুর জঙ্গল ছিলো। এসব কেটে বসতি তৈরি করা হয়েছিলো। গরুর খাদ্যের অভাব ছিলো না। তাই দুধ বেশি ছিলো। এই দশ বিশ ধরে চারণ ভূমি একেবারে কমে গেছে। গরু চড়ানো যায় না। ঘাস নাই। গরু লালন পালনও জানেনা অনেকে। তারা অভিযোগ করে বলেন, অন্য একটা অঞ্চল থেকে তারা এখানে বসতি স্থাপন করায় প্রায় সময় নানা দিক থেকে বৈষম্যের স্বীকার হতে হয় তাদের। তবে, তাদের গ্রামে সকলের মাঝে একতা আছে।
গ্রামের বর্তমান দুধ ব্যবসায়ী মুসা মিয়া বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে এই ব্যবসা করে ঠিকে থাকা সম্ভব না। দুধের প্রতি মানুষের আলাদা চাহিদা থাকলেও আমরা দুধ দিতে পারি না কারণ দুধ কম থাকে আমাদের কাছে। গরু দুধ দেয় না। ঘাস নাই। চারণ ভূমি নাই। সরকার যদি আমাদের খামারের মাধ্যমে ব্যবস্থা করে দিতেন তাহলে বেশ উপকার হতো।’
রহম আলী নামের একজন বলেন, ‘আমার দাদা এই ব্যবসা করতেন। যদি সরকারি সাহায্য থাকে তাহলে আমরা আবার এই ব্যবসায় ফিরে আসবো।’
পাবনা বিজ্ঞাণ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)’র পদার্থ বিজ্ঞাণের মেধাবী ছাত্র মফিদুল ইসলাম এই গ্রামের আনফর আলীর ছেলে। তিনি বলেন, ‘এই গ্রামে যদি প্রপার প্রশিক্ষণ দিয়ে গরু পালনে উদ্ভুদ্ধ করা হয় তাহলে দুধের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে আসবে। সরকারি ভাবে যদি পশু পালনে সাহায্য করা যায় দুধ একটি বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। আমাদের এলাকার মানুষ খুব পরিশ্রমী,তারা পারবে। আমাদের আহবান, সরকার যেনো এগিয়ে আসেন।’

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :272 বার!

error: Content is protected !!
JS security