দুদকের ফাঁদে পা দিয়েছেন যে সব এমপি মন্ত্রীরা

গ্লোবাল ডেস্কঃ-  সম্পদের তথ্য গোপন, অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও দেশের বাইরে অর্থ পাচারের অভিযোগে অন্তত অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য, বিএনপি নেতা এবং সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্যও রয়েছেন। এদের মধ্যে অনেককে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। বাকিদেরও শিগগিরই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত প্রক্রিয়ায় তা নিষ্পত্তি করা হবে। দলমত-নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতাদের অনুসন্ধানের আওতায় আনাকে স্বাগত জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ ক্ষেত্রে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে দুদককে কাজ করার আহ্বান তাদের। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা দেখছি দুদক সরকারের এমপি, প্রভাবশালী নেতাসহ অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনছে। এটা ভালো দিক। তবে দেখার বিষয় হচ্ছে, এর মধ্যে দুদক কোনো বৈষম্য করে কি না। আমরা মনে করি রাজনৈতিক নেতাদের বিষয়ে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দুদকের কোনো ধরনের বৈষম্য করা ঠিক হবে না। তাহলে দুদক বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। আশা করছি দুদক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জন করবে। এ ক্ষেত্রে কে কী বলল তা দেখার বিষয় নয়।’ দুদক সূত্র জানায়, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে গ্রেডিং পদ্ধতিতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৭৫ ভাগ গ্রেডিংয়ের ভিত্তিতে অনুসন্ধান কাজ শুরু করে দুদক। এ ক্ষেত্রে কে কোন দলের তা দেখার সুযোগ নেই। জানা গেছে, প্রভাবশালীদের সম্পর্কে দুদক তথ্য নিচ্ছে রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ভূমি রেজিস্ট্রেশন অধিদফতরসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে। এ ছাড়া সাবেক ও বর্তমান এমপিদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা থেকেও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে সংস্থাটি। কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিদেশে টাকা পাচারসহ সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় আট নেতার বিরুদ্ধে। দলটির এই আট নেতা হলেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও এম মোরশেদ খান, যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও নির্বাহী সদস্য তাবিথ আউয়াল। এ ছাড়া একই অভিযোগ আসায় মোরশেদ খানের ছেলে ব্যবসায়ী ফয়সাল মোরশেদ খান এবং ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের বিষয়েও অনুসন্ধান করছে দুদক। লালমনিরহাটের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা আসাদুল হাবিব দুলু এবং ঝিনাইদহ-৪ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, বগুড়া-৩ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মোমিন তালুকদার, তার স্ত্রী মাছুদা মোমিন ও ভাই আবদুল মুহিত তালুকদারের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে।

বিএনপি নেতারা ছাড়াও ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেও দুদকের অনুসন্ধান চলছে। এরা হলেন- আওয়ামী লীগের ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য বি এইচ হারুন, খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিজান, পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল, নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার লিমিটেডের সভাপতি কামরুল আশরাফ খান ও শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ আতিউর রহমান আতিক। এ ছাড়া শরীয়তপুরের একজন সাবেক সংসদ সদস্য, নারায়ণগঞ্জের একজন সংসদ সদস্য এবং বরিশালের একজন সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধান চলছে। এ ছাড়া মহিলা আসনে জাতীয় পার্টির এমপি মেহজাবিন মোর্শেদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলা হয়েছে।

এ ছাড়া বগুড়া-২ আসনে জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, নোয়াখালী-৬ আসনের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী, চাঁদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শামছুল হক ভূঁইয়া, নীলফামারী-৪ আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি শওকত চৌধুরী ও তার স্ত্রী মাহবুবা খাতুনের বিরুদ্ধেও দুদকের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এদিকে সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছর ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির এক শীর্ষ নেতাকে তলব করে দুদক। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি ও অন্যান্য কারণ দেখিয়ে দুদকে হাজির না হয়ে জাপার সাবেক মহাসচিব হাওলাদার হাজিরা থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন। পরে তাকে আবারও হাজির হতে চিঠি দেয় দুদক। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনি রিট করলে হাই কোর্ট ওই নোটিসের কার্যকারিতা চার সপ্তাহ স্থগিত করে। দুদক আপিল বিভাগে গেলে হাই কোর্টের আদেশ স্থগিত হয়। ফলে সাবেক মন্ত্রী রুহুল আমিন হাওলাদারের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানে কোনো বাধা থাকেনি। দুদক কর্মকর্তারা জানান, দশম সংসদ নির্বাচনের পরপর দুদকের মুখোমুখি হতে হয়েছে সরকারের সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিদের। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। এরা হলেন- সাবেক গণপূর্ত ও গৃহায়ণ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, কক্সবাজার-৪ আসনের এমপি আবদুর রহমান বদি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির যুগ্ম-মহাসচিব ও ময়মনসিংহ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ মুক্তি, জাপা নেতা নীলফামারী-৪ আসনের এমপি মো. শওকত চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলছে।

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :128 বার!

error: Content is protected !!
JS security