ব্রিটিশ রাজপরিবারে যত ‘প্রেমের জ্বালা’!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:- ব্রিটেনের রাজসিংহাসনের দাবিদারদের মধ্যেই রয়েছেন প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান মার্কেল। কিন্তু সম্প্রতি হঠাৎই রাজপরিবার ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান এই দম্পতি। তাদের আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে হইচই পড়ে গেছে রাজপরিবারে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা রাজপরিবারের সঙ্গে আলাপও করেননি বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো। এতে ‘ব্যথিত’ হয়েছেন পরিবারের অন্যরা। অভিনেত্রী মার্কেলের (৩৮) সঙ্গে ব্রিটিশ প্রিন্স হ্যারির (৩৫) প্রেম নিয়েও ছিল নানা আলোচনা-সমালোচনা।

অবশেষে ২০১৭ সালের শেষের দিকে যখন তাদের বাগদান হয়েছিল, তখনই অভিনয় ক্যারিয়ারের ‘ইতি’ ঘোষণা করেন মেগান। এরপর ২০১৮ সালের শুরুর দিকেই বিয়ে করেন হ্যারি ও মেগান। যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য হন মেগান। শুরুতে রাজপরিবারে তাদের নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল নানা জটিলতা। ২০১৯ সালের ৬ মার্চ জন্ম নেয় হ্যারি-মার্কেলের ছেলে আর্চি। এরপর রাজপরিবারের প্রথা অনুযায়ীই চলতে থাকে তাদের জীবন। সবশেষ গেলো বড়দিন উদযাপনের জন্য স্ত্রী মার্কেল ও ছেলে আর্চিকে নিয়ে কানাডায় গিয়েছিলেন হ্যারি। গত ৭ জানুয়ারি সেখান থেকে ফেরেন তারা।

এর পরদিনই (৮ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ রাজপরিবার থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। এই ঘোষণা দেওয়া আগে রাজপরিবারের কারো সঙ্গে আলাপ তো দূরের কথা, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও তাদের বিষয়টি জানতেন না। বিবৃতিতে তারা বলেন, পরস্পরের সঙ্গে অনেক আলোচনার পর আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে পদত্যাগ করলেও রানিকে সমর্থন করা অব্যাহত রাখতে চাই। আমরা আর্থিকভাবে স্বাধীন হওয়ার জন্য কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছি। তারা যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে সময় ভাগাভাগি করে থাকতে চান বলেও জানিয়েছে ওই বিবৃতিতে।

তাদের এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১৩ জানুয়ারি) বৈঠকে বসবেন রাজপরিবারের সদস্যরা। সেই বৈঠকের আগেই কানাডায় চলে গেছেন রাজবধূ মেগান মার্কেল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির সংবাদদাতা জনি ডায়মন্ড বলেন, রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে প্রিন্স হ্যারি ও মেগানের যে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, এই সিদ্ধান্তই সেটির প্রমাণ। কিন্তু রাজপরিবার থেকে বাইরে গিয়ে তারা কতদিন থাকতে পারবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। অনেকেই বলছেন, প্রেমের কারণেই রাজপরিবার ছেড়ে বাইরে যেতে চাইছেন হ্যারি। কারণ রাজপরিবারের জীবনে যে নিয়ম-কানুন, বাধা, বিলাসী জীবন, প্রথা, প্রচলিত রীতি, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে এগুলো থেকে দূরে সরে যেতে চাচ্ছেন হ্যারি। এমন সাধারণ জীবনই পছন্দ তার স্ত্রী মার্কেলের।

এছাড়া রাজপরিবারের প্রচলিত প্রথাগুলো মানতে মানতে একঘেঁয়ে হয়ে উঠছিল হ্যারি-মেগান দম্পতির জীবন। তারা এসব ছেড়ে সাধারণ জীবন যাপন করতে চান। এছাড়া বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে দ্বন্দ্বও রয়েছে হ্যারির। যা সংবাদমাধ্যমে এসেছে বহুবার। হ্যারির রাজপরিবার ছাড়ার কারণগুলোর মধ্যে এটিও অন্যতম বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রেমের কারণে ব্রিটিশ রাজপরিবার এবারই প্রথম জ্বালা অনুভব করছে, বিষয়টি এমন নয়। বিয়ের ১২ বছর পর ১৯৯২ সালে হ্যারির মা প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তার বাবা ও রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ছেলে চার্লসের। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ছাড়াও এই বিচ্ছেদের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল চার্লসের প্রাক্তন প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার বোলস। রাজপরিবারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ২০০৫ সালে ক্যামিলাকে বিয়ে করেন চার্লস। এই বিয়েতে চার্লসের মা, অর্থাৎ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ উপস্থিত ছিলেন না। ছিলেন না পিতা ফিলিপও।

অন্যদিকে চার্লসের স্ত্রী থাকাকালীন এবং বিচ্ছেদের পরেও একাধিক পুরুষের সঙ্গে ডায়ানার সম্পর্কে জড়ানোর কথা শোনা যায়। এদের মধ্যে বেশি আলোচিত হয়েছে মিশরের চলচ্চিত্র প্রযোজক দোদি আল ফায়েদের সঙ্গে সম্পর্ক। ১৯৯৭ সালে প্যারিসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ডায়ানা-দোদি। ডায়ানার জীবনযাপন বিষয়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের অসন্তোষ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই আলোচিত হয়েছে। এদিকে চার্লসের ছোট বোন রাজকুমারী অ্যানেও বহু পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। এদের মধ্যে আলোচনায় আসে চার্লসের দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যামিলার সাবেক স্বামী অ্যান্ড্রু পার্কার বোলসের নাম।

এছাড়া অ্যানের স্বামী মার্ক ফিলিপসও বিভিন্ন সময়ে অনেক নারীর সম্পর্কে জড়িয়ে রাজপরিবারকে জ্বালা উপহার দেন। এই তালিকায় রয়েছে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ছোট বোন রাজকুমারী মার্গারেটও। তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন পিটার টাউনসেন্ডের সঙ্গে প্রেম করে। কারণ টাউনসেন্ডের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল। আর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে এমন কারো সঙ্গে রাজপরিবারের সদস্যের বিয়ে হওয়া সে সময় ছিল অসম্ভব। পরে পরিবারের চাপে টাউনসেন্ডকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেন মার্গারেট। পরবর্তী সময়ে চিত্রগ্রাহক অ্যান্টনি আর্মস্ট্রং-জোনসের সঙ্গে তার বিয়েও সৃষ্টি করেছিল বহু বিতর্ক! মার্গারেটেরও আগে মার্কিন নাগরিক ও বিবাহ-বিচ্ছেদপ্রাপ্ত ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করার জন্য রাজকর্তব্য থেকে সরে আসেন অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড।

সেই সময় রাজার আসনে বসতে চলা অ্যাডওয়ার্ডের এই পদক্ষেপ আলোড়ন তোলে। এর ফলে তার ছোট ভাই ষষ্ঠ জর্জ রাজা হন। অ্যাডওয়ার্ড-ওয়ালিসের বিবাহ এখনও রাজপরিবারের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে আলোচিত। রাজপরিবার ছাড়তে হ্যারির নেওয়া সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্তকেও অনেকে অষ্টম অ্যাডওয়ার্ডের মতো পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিতর্কিত হয়েছেন রানি এলিজাবেথের তৃতীয় সন্তান অ্যান্ড্রুও। মার্কিন অভিনেত্রী কু স্টার্কের সঙ্গে তার সম্পর্ক এর মধ্যে অন্যতম। পরবর্তীতে সারা ফার্গুসনকে বিয়ে করলেও কু স্টার্কের কন্যার ‘গডফাদার’ হন অ্যান্ড্রু। যা তাকে বেশ আলোচনা-সমালোচনার মুখে ফেলে। অতীতের বিভিন্ন ঘটনায় যেমন রাজপরিবারে বহুবার টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনিই টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল হ্যারি ও মার্কেলের প্রেমের শুরুর দিকেও। অবশেষে সব কাটিয়ে তারা বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। কিন্তু এরপরেও বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক ছিলই। এর মধ্যে হ্যারির সঙ্গে বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়াম।

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :114 বার!

JS security