ভারি বর্ষণে ধান পচে নষ্ট, রবির কিরণে হাসির ঝিলিক, এক মাসে বজ্রপাতে ১৯ জন নিহত

বিপ্লব রায়, সুনামগঞ্জ: গত বছর আগাম বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার পর এবছর সুনামগঞ্জের হাওড়ে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও শ্রমিক সংকট, বৈরী আবহাওয়ায় দিশেহারা কৃষক। একদিকে জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি অন্যদিকে বজ্রপাতের আতঙ্ক।

হাওর-বাঁওড় আর বৃষ্টি-বাদলের জেলা সুনামগঞ্জ। এজেলায় কখনো এবছরের মত বজ্রপাতের আতঙ্ক দেখা যায়নি। কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে জেলার ১১ টি উপজেলার হাওড়পাড়ের কৃষকের ধান বাড়িতে আসলে রৌদ্র না থাকায় ধানের উপর চারা গজে উঠছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মণ ধান। দীর্ঘ ১০দিন ধরে বৃষ্ঠি অব্যাহত থাকায় হাওড় থেকে আসা ধানগুলো নষ্ট যাওয়ার উপক্রম।

এদিকে বজ্রপাতের আতঙ্কে কৃষকরা ধান কাটতে ভয় পাচ্ছে তেমনি বাড়িতে আসা ধানগুলোও পঁচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাওড়পাড়ে এখন আকাশ কালো হয়ে উঠতে শুরু করলেই মাঠ-ঘাট-ক্ষেত থেকে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে শুরু করে মানুষ। একের পর এক প্রানহানিতে মৃত্যুর মিছিলে সরাগম হচ্ছে সুনামগঞ্জ।

মৃত্যুদূতের মত বজ্রপাত এসে মুহুর্তে প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে কৃষকদের। কিন্তু স্বজন হারানো পরিবারগুলোর হাহাকার আর আহাজারি বৃষ্টি ছাপিয়ে বইছে হাওরাঞ্চলে। যারা নিহত হয়েছে তাদের বেশির ভাগই পরিবারের অন্ন জোগানোর ভরসা ছিল। মাঠে ফসল কাটতে, ধান গোলায় তুলতে গিয়ে এসব লোকেরা নিহত হয়েছে। একদিকে টানা বৃষ্টি তার সঙ্গে বজ্রপাত কৃষকদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

বজ্রপাত আতঙ্কে ধান কাটতে যেতে চাচ্ছেন না শ্রমিকরা। ১ মাসে ১০ এপ্রিল দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার কাচিরভাঙা হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে মোহাম্মদ জালু মিয়া নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। ১১ এপ্রিল ডিগারকান্দি গ্রামের মোহাম্মদ জালু মিয়া ও জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামসি আবদুল্লাহপুর গ্রামের আদরিছ মিয়ার ছেলে সুহেল মিয়া, ২৯ এপ্রিল সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামের লিটন মিয়া মারা যান।

৩০ এপ্রিল দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় কানাইঘাটের রায়পুর গ্রামের মোহাম্মদ ইয়াহিয়া। ১ মে সদর উপজেলার মোল্লারপাড়া ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের রশিদ মিয়া, জামালগঞ্জ উপজেলার কমলাকান্ত তালুকদার, কলকতা গ্রামের মুক্তার আলীর ছেলে হিরণ মিয়া, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আলম মিয়া মারা যান। ৪ এপ্রিল বজ্রপাতে মারা গেছেন মোহম্মদ জাফর মিয়া।

তিনি উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি গ্রামের মৃত লাল মামুদ আলীর ছেলে। ৫ মে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক এখলাছুর রহমান ৭ মে সকালে শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরে বজ্রপাতে কৃষক নবকুমার দাস মারা যান। ৮ মে তাহিরপুরে কৃষক নূর হোসেন শনির হাওরের ধান ক্ষেতে মারা বজ্রপাতে মারা যান। তিনি ওই উপজেলার ভাটি তাহিরপুরের মুক্তুল হোসেনের ছেলে।

একই দিনে দিরাই উপজেলার ৯নং কুলঞ্জ ইউনিয়নে ধানের খলায় কাজ করার সময় বজ্রপাতে মারা যান বয়োবৃদ্ধ কৃষক মুসলিম উদ্দিন। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের পুরানগাও গ্রামের মৃত হযরত আলীর স্ত্রী শাহারা বানু(৫৫) খলায় ধান শুকাতে গিয়ে মারা যান।

ফতেহপুর ইউনিয়নের সিদ্দিরগাঁও গ্রামের সোমা বেগম(২২) নামের এই কৃষানীও ধান শুকাতে গিয়ে নিহত হন। দোয়ারাবাজর উপজেলার ডুমবন্ধ গ্রামের আসাদ আলীর ছেলে ফেরদৌস মিয়াও নিহত হন।

৯মে শাল্লা উপজেলার কালিয়াকুটা হাওরে ধান কাটতে গিয়ে আলমগীর হোসেন (৩২) নামে এক কৃষক নিহত হন। ধর্মপাশা উপজেলায় উজ্জল মিয়া নামে এক কৃষক বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এছাড়া আরো আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন কৃষক। আহত কৃষকরা চিকিৎসাধীন আছে বিভিন্ন হাসপাতালে।

তাহিরপুর উপজেলার কৃষক কুদ্দুস মিয়া জানান, ২ সপ্তাহ ধরে বৃষ্ঠি থাকায় হাওড় থেকে আসা ধানগুলোও খলায় এখন পচে নষ্ট হচ্ছে। আর এসব ধানের উপর দিয়ে লম্বা লম্বা চারা গজাচ্ছে। এছাড়া বজ্রপাতের আতঙ্কে হাওড়ে ধান কাটা যেতে ভয় পাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার বরকতুল্লাহ খান বলেন, হাওড়ে কৃষকদের জন্য বজ্রপাত আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন হাওড়ে এখনো ৩০ ভাগ ফসল কাটার বাকি রয়েছে। এবছর শ্রমিক সংকটের কারনে হাজার টাকা দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আর নতুনরুপে সৃষ্টি হল বজ্রপাত।

এই বজ্রপাতের ফলে অনেক কৃষকরাই হাওড়ে যেতে ভয় পাচ্ছে। তবে বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য সরকার হাওরাঞ্চলে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি জানান।

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :675 বার!

JS security