যত অত্যাচারই করুক আমৃত্যু বিএনপিতেই থাকব :ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ

সদ্য প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ জাতীয়তাবাদী শক্তি তথা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র নেতা হিসেবেই মরতে চেয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাই-ই হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ওয়ান-ইলেভেনের আগে পর্যন্ত একাধিক দল পরিবর্তন করেছেন তিনি। তবে সর্বশেষ ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদকে সহযোগিতা করতে রাজি হননি। এ কারণে তাকে জেল খাটতে হয়েছিল এবং অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকে গুলশানের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে। বাসার সামনে ইটের ওপর বসে শিশুর মতো অঝোর ধারায় কেঁদেছেন।’ গত মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মওদুদের মৃত্যুর পর গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেছেন নোয়াখালী অঞ্চলের বিএনপির নেতারা।
মুক্তিযুদ্ধের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি তখন তার হয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন মওদুদ আহমদ। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনা করেন তখন তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। জিয়াউর রহমানের জাগদল এবং পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ১৯৯৬ সালে বিএনপিতে ফিরে আসেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গণতন্ত্রের জন্যই কাজ করেছেন তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে। সেখান থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। সেজন্য তাকে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জেল খাটতে হয়েছে এবং নির্যাতিত হয়েছেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তিনি নিগৃহীত হয়েছেন।’
মওদুদ আহমদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত ওয়ান-ইলেভেনের সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ রাজনৈতিক দল গড়তে প্রয়াত মওদুদ আহমদের সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মঈনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, জীবনের বাকি দিনগুলো বিএনপিতে থাকতে চাই। বিএনপিতে থেকেই মরতে চাই। ফলশ্রুতিতে তখন বাসায় মদ রাখার অপরাধে তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে ৩২টি মামলা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘বিগত দিনে দল পরিবর্তন করলেও এখন দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে যাব না। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যাব না। বিএনপির পতাকাতলে থেকেই মরতে চাই।’
মওদুদ আহমদের ঘনিষ্ঠ বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সময় মঈন উ আহমেদ মওদুদ আহমদের কাছে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। মেসেজে মওদুদ আহমদকে বলেছিলেন, ‘আপনি আমার এলাকার রাজনীতিবিদ। …আপনি আমাকে সহযোগিতা করুন।’ তবে মওদুদ আহমদ সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এ কারণে তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে এক বছরেরও বেশি সময় থাকতে হয়েছিল।’
আবেদ আরও বলেন, ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের মানিকপুরে তার বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে যেন সমাহিত করা হয়। তিনি নিজেও আমাকে সেই জায়গা দেখিয়েছিলেন। এটাই তার শেষ ইচ্ছা ছিল। তার সেই ইচ্ছা পূরণে মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে।’
মওদুদ আহমদ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে পুলিশি নির্যাতনের পর তার ঠাঁই হয়েছিল কারাগারে। এ ঘটনা মনের অজান্তেই তাকে করে তোলে রাজনীতি-সচেতন। ঢাকা কলেজ ছাত্রসংসদের আপ্যায়ন সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অ্যাডভোকেট ফরমান উল্লাহ খান প্রতিষ্ঠিত খেলাফত রব্বানীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির নেতা ছিলেন।
মওদুদ আহমদের স্মৃতিচারণ করে দৈনিক দিনকালের ফটো সাংবাদিক বাবুল তালুকদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘আপনি আপনার কথা রেখেছেন ভাই, পরম করুণাময় আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনার সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে জান্নাতবাসী করবেন, আমীন…।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘সেনা-সমর্থিত সরকারের শেষ দিকের ঘটনা, ন্যাম ভবনের সামনে ফুটপাতে বসে আছি এমন সময় টেলিফোনে খবর আসল ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ভাই মারা গেছেন, জানাজায় অংশ নিতে তিনি এক ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পাবেন। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলাম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, শত শত পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি ঠেলে পৌঁছে গেলাম কারা ফটকের ঠিক সামনে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে করতেই আবারও ফোনে সংবাদ আসল জানাজা সম্পন্ন হয়ে গেছে। বড়ই আফসোস, তিনি ভাইকে এক নজর শেষ দেখা দেখতে পারলেন না ও জানাজায় শরিক হতেও পারলেন না…। পরে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে নেওয়া হয়। প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে আমায় ডাকলেন এবং বললেন ‘শোনো, ওরা যত অত্যাচারই করুক আমি আর বিএনপি ছাড়ছি না, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দলটিতেই থাকতে চাই। সত্যিই তিনি তার কথা রেখেছেন।’

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :82 বার!

JS security