হাওরে জলাবদ্ধতা অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণকে দায়ি করছেন কৃষকরা

বিপ্লব রায়, সুনামগঞ্জ থেকে:-
গেল দু’বছর পরপর সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে ব্যাপক বিপর্যয়ের পর এবার বাম্পার ফলন। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি ফুটতে না ফুটতে আবারও শঙ্কা জলাবদ্ধতায় পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার। তার উপর শ্রমিক সংকট প্রতিটি হাওরে হাওরে। মাঠভরা ফসল কিন্তু তা ঘরে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। কয়েকদিনের বর্ষণের ফলে জেলার বেশ কিছু হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে বজ্রপাত আতঙ্ক কৃষকের কাছে ‘মরার উপড় খাড়ার ঘা’। জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের দাবি এপর্যন্ত জেলায় ৮০% ধান কাটা শেষ। তবে কৃষক ও কৃষি বিশ্লেষকরা এর পরিমান আরো ৪০% বলে জানিয়েছেন। জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে অপ্রয়োজনীয় বাঁধকেই দায়ি করলেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় অপ্রয়োজনীয় বাঁধ হয়েছে বাধ নির্মানে নীতিমালা লংঘন করে স্থানীয়দের সাথে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই। যার ফলে এখন হাওরে হাওরে জলাবদ্ধতা। পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণের বিরুদ্ধে বারবার অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নিয়ে অভিযোগ করলেও তখন দায়িত্বপ্রাপ্তরা গুরুত্বপূর্ণ এবিষয়টি আমলে নেননি। অপ্রয়োজনীয় বাঁধের নামে সরকারি অর্থ লুটপাট ও আত্মসাৎ করতেই এসব অপ্রয়েজনীয় প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। তাদের দাবি কয়েকদিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে গেছে হাওরে হাওরে পাকা ধানের ফসলীজমি।
সরেজমিন ডাকুয়ার হাওরের কৃষকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, হাওরবাসি বাঁধ নির্মাণের পূর্ব থেকেই প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার অবহিত করেছিল অপ্রয়োজনীয় স্থানে বাঁধ নির্মান নিয়ে। তারপরও কর্তৃপক্ষ এসব স্থানে বাঁধ দিয়ে সরকারী টাকার অপচয়ের পাশাপাশী ডাকুয়ার হাওরবাসির জন্য স্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি করেছেন। যা স্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নিয়েছে। তারা বলেন লুটপাটের উদ্ধেশ্যে এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছিল। অথচ যেখানে জনগন দাবি করেছে সেই স্থান স্বার্থান্নেসি মহলের স্বার্থ রক্ষায় প্রকল্প নেয়া হয়নি। বাঁধ নির্মাণ কোথাও কোন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়নি উল্লেখ করে তারা বললেন, বাধণির্মানে নীতিমালা লংঘন করে স্থানীয়দের সাথে আলাপ আলোচনা না করে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। তারা আরও জানান আমরা এইসব অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মানের প্রতিবাদে গত ১৩ মার্চ মানববন্ধনসহ ভিন্ন ভিন্ন সময় নানা প্রতিবাদ কর্মসুচি পালন করেছি কিন্ত কাজ হয়নি। এখন আমাদের সোনার ফসল জলাবদ্ধতার কারণে পানির নিচে। এমন দৃশ্য জেলার অন্যান্য হাওরেও।
সুনামগঞ্জের হাওরে এ বছর প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। এবার ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জের ৫২টি হাওরে এসব বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত করা হয়। যা অন্যান্য যে কোন বছরের তুলনায় ছিল ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য সর্বাধিক বরাদ্ধ। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এর মাধ্যমে এসব বাঁধের কাজ করানো হয়েছিল। যার মধ্যে বেশকিছু অপ্রয়োজনীয় বাঁধও নির্মাণ করা হয়েছে বলে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট হওরের কৃষকদের কাছ থেকে। এখন সেইসব হওরেই পানি নিষ্কাশন হচ্ছেনা।
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জে অন্তত ৫০০০ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলে কৃষকরা দাবি করছেন। এ কারণে পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে গিয়ে নতুন করে দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন কৃষকরা। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতা আরো বাড়বে। তখন জমির ধান জমিতেই নষ্ট হয়ে যাবে বলে জানান কৃষকরা। জেলায় এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে।
একইভাবে সদর উপজেলার মোহনপুর ও কাঠইর ইউনিয়নের ডাকুয়ার এবং ছন্দোয়ার হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। মোহনপুর ইউনিয়নের উজান রামনগরে জোয়ালভাঙ্গা হাওর রক্ষার নামে একটি অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মান করা হয়েিেছল গ্রামের মানুয়ের সাথে আলপ আলোচনা ছাড়াই। সেখানে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বাড়ির সামনের মাঠে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়ায় হাওর থেকে কেটে আনা ধান শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। তাদের দাবি, অপ্রয়োজনীয় বাঁধ দিয়ে একই হাওরকে আলাদা করায় এখন জলাবদ্ধতা এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জলাবদ্ধতার শিকার এক অংশের কৃষক নিজেদের পাকা ধান বাঁচাতে রাতের আঁধারে বাঁধ কেটে দিতে পারে এমন আশঙ্কায় একই হাওরের পার্শ্ববর্তী অংশের কৃষকরা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। শুধু মোহনপুর ইউনিয়নেই নয়, রঙ্গারচর ইউনিয়নেও একাধিক বাঁধের কারণে লালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে এবছর এমনিতেই হাওরে তীব্র ধান কাটা শ্রমিকের সংকট। এর মধ্যে “মরার উপর খাড়ার ঘা” হয়ে দাড়িয়েছে বজ্রপাতের ভয়। বজ্রপাতের ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত দইু সপ্তাহে জেলায় (এ রিপোর্ট লেখা) শনিবার পর্যন্ত ১৬ জন নিহত হয়েছেন বজ্রপাতে। এ কারণে ধান কাটায় বিঘœ ঘটছে প্রায় সবগুলো হাওরে। ফলে প্রতিকুল আবহাওয়ার কারণে থেমে থেমে কাজ করতে হচ্ছে কৃষকদের। অন্যদিকে রোদ না থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছেনা। ফলে জেলার ধান উৎপাদনের লক্ষমাত্র অর্জিত হওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে কৃষি বিশ্লেসকদের।
ডাকুয়ার হাওরের কৃষক আহমদ আলী জানালেন, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে আমাদের হাওরের অন্তত ১০টি গ্রামের কৃষকের পাকা ধানের জমিতে কোমড় ও হাঁটু পানি। আরো বৃষ্টি হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
পাকা ধান জমিতে। অথচ পানি থাকায় কেউ ধান কাটতে রাজি হচ্ছে না। তাই দ্বিগুণ মজুড়িতে শ্রমিক এনে ধান কাটনো যাচ্ছেনা। অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়া ও বজ্রপাতের হলো হাওরে আরে আতঙ্কের নাম।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা জানান, হাওরে ৮০ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু হাওরে ধান এখনো আছে, তবে বৃষ্টিতে লক্ষ্যমাত্র অর্জনে কোনো প্রভাব পরবে না বলে জানান তিনি।
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি বীর মুক্তিযুদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, হাওরবাসীর কাছে এখন আতঙ্কের আরেক নাম বজ্রপাত। আর বৃষ্টির কারণে হাওরে হাওরে অনেক স্থানে মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতা দুর্যোগ তৈরি করা হয়েছে। যা আমরা আগে থেকেই বলে আসছিলাম ৪৯টি অপ্রয়োজনীয় বাঁধের তালিকা করে সংশ্লিষ্টদের দিয়েছি এবং বারবার বলেছি। এগুলোই এখন কৃষকদের জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছে। শ্রমিক সংকটতো রয়েছেই। তিনি আরও বলেন, শ্রমিক সংকটের কারণে জেলার প্রায় সব হাওরেই এখনো কিছু ধান রয়ে গেছে কাটার বাকি। জলাবদ্ধতার কারণে হাওরের ভেতরে যে কাটা ধানগুলো পরিবহনে অনেক দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাড়ি আনা নিয়ে। সেগুলো এখন নৌকা দিয়ে আনতে অসুবিদা মাথায় করে বাড়ি আনতেও অসুবিধা। তাই আগমী বছর প্রকল্প নেয়ার সময় ভেবে চিন্তে প্রকল্প ও পিআইসি গঠনের পরামর্শ দেন তিনি।

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :675 বার!

error: Content is protected !!
JS security