অব্যক্ত কথাকলি


———————–
নীরেশচন্দ্র রায়
১.
ফেরিওয়ালার কাজে নিযুক্ত থেকে আমি মানুষ আবিষ্কার করেছি। মানুষে-মানুষে দেখেছি অমানুষের মিলন মেলা। হেলারও ছলে জমে মেলা তাইতো আমি আজ মেলার ফেরিওয়ালা। হয়তো এই মেলাই হবে একদিন মহা মিলনের মহাকাব্য, এর প্রতিটি পঙতিতে থাকবে অঝর ধারার প্রেম।
খুঁজবে সবাই প্রেমের বাঁশীওয়ালাকে।
২.
ফুটন্ত শিমুল কলির মতো লালাভে আমার জীহ্বাগ্র স্পর্শ করতেই বোয়ালের মতো লম্ফঝম্ফ করলে তৃপ্ততায় আলিঙ্গন করলে প্রকৃতিকে।
অমানিশায় দীপাবলীর আলো প্রজ্জ্বলিত হলো দীপশিখা।
আমি সেই আলোয় স্নান করে তীর্থ যাত্রা করলাম চির মহামিলনের প্রত্যাশায়। যবনিকা হলো প্রশান্তির। কেহ বলিল আমি অস্পৃস্য!
আমি জানি-আমি তোমারই জন্য আগুন্তক।
৩.
চন্দ্রের আলোয় দীপ্তমান পত্রপল্লব আমাকে বলল তুমি শাখাগ্রে অবস্থান করো, এখানে বসে পতঙ্গ নৃত্য অবলোকন করো স্বচিন্তনে,আর রচনা করো কাব্যিক ভাবনা,সৃজন করো স্পর্শমনি।
তাই হেথায় বসে রচি মিলনকথা। বিচ্ছেদ আমায় কষ্মিনকালেও স্পর্শ করেনি, কেনইবা করবে–?
আমিতো মহাশশ্মানে দাঁড়িয়ে বিচ্ছেদকে ভষ্মিভূত হতে দেখেছি প্রাচীন ভলগা নদের তীরে।
৪.
তথাকথিত সভ্যরা অসভ্য বলে সত্যাশ্রিত সভ্যদের বুঝা যায় স্পষ্টই সভ্য কারা কিন্তু বলা যায় না,বললেই সীমারের খড়গ প্রস্তুত। মৃত্যুঞ্জয়ী কয় জনা হতে পারে? মাস্টারদা বহু পূর্বেই চলে গেছেন পরপাড়ে, আমরাও একদিন দেখব বিদায় ক্ষণ তাই কাপুরুষ না হয়ে বীর পুরুষ হতে আপত্তি কোথায়? হয়তো মরন বীন বাজিয়ে ওঝা নাশিবে বিষক্রিয়া। না হয় বিষ পান করে বিশ্বাম্বর হয়ে রইলাম।
সেদিন আমার সমাধি না হয় হইলইবা পরিত্যক্ত।
৫.
যৌনতার মোহ নিমিষেই শেষ কিন্তু প্রেমের মোহ নিরবধি। প্রেয়সী বিহীন যেমন প্রেমিক অর্থহীন,তেমনি উল্টোটাই হয়। রাইবিনদিনী কী আজও অপেক্ষায় কানাইয়ের জন্য! আমি অর্থহীন আবেশে অর্থ খুঁজি। বিশ্বর ইচ্ছা মৃত্যুর মতই শেষ দৃশ্যের অপেক্ষায় থাকি। দুর্যোধনের অসহনীয় আচরণই কুরু বংশ নির্মূলের কারন। আমি নির্মূল হবো তোমাতে যেখানে বাস করে বাংলার সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল নক্ষত্র। যদিও এর উত্তাপে দগ্ধ হয় সবই। আমি কিন্তু নির্মূলতাতেই স্থায়ী হতে চাই, তোমরা দেওনা আমাকে নির্মূল করে।
৬.
সময় দ্রুত প্রবাহিতা পানির স্রোতধারার চেয়েও চঞ্চল। সময়-সময়ের কবিতা লেখে। সময়ের আরেক নাম কবিতা। আমার প্রেমিকার নামও কবিতা। কবিতা আজ কারাবন্দী স্বাধীনতার
গরমিলে। আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছি কিন্তু কবিতা আমার পিছু ছাড়ছে না। দেবযানী মেঘনাদের মৃত্যু কাতরতায় বীরাঙ্গনা হয়ে উঠেছে, আমাকেও বলছে যুদ্ধে সাথে যেতে তাই আমিও আজ যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত।
৭.
মসলা ছাড়া মাংস খেত আদিম মানুষেরা। আগুন আবিষ্কারের পূর্বে কাচা মাংস খেত। তবে নর মাংস খেত না। বলত চর্যাপদের শ্লোকে,”আপনা মাংস হরিনা বৈরী”। এখনও তাই, তবে নররা কিন্তু নারী মাংস ভক্ষণ করে! নারী মাংস এতই সুস্বাদু যে নররা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তাহলে-সভ্যতা কিসের?সেতো মিথ্যে কথার ফুলঝুড়ি বাসর রাতের কাগজের ফুলের মতো। সৌরভ মোটেও নেই,শুধুই মিথ্যে বিলাসী জীবন। আমার মনে হয় সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরই সত্যিকারের বাসর ঘর।
৮.
স্বপ্নে বিভোর হয়ে স্বপ্নকে সত্যি ভাবা বোকামী। আমি বোকাদের দলে তাই মেনে নিলাম বঞ্চিত বিলাসী জীবন! পরিনতি হলো অবজ্ঞা আর অবহেলায়। হাসির খোড়াক হয়েছি বহুলাংশে পদেপদে। জীবনের মানে খুঁজেছি স্বপ্নে। আমি স্বপ্নদ্রষ্টা বলে সৃজনীতে আত্ম নিয়োগ করি। সৃজনীই আমার অহং, কেউ বলে বাহ্য জ্ঞানহীন এক বোকা! বোকামীতে যে কত আনন্দ সেটা বোকারাই জানে।
৯.
ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাওয়া কিছু মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, তাতে সহসা বিপত্তি হয়। মরণের আগে এভাবেই মরে এ মৃত্যুকেই জীবন্মৃত্যু বলে। তাতে পদ মর্যাদারও স্খলন ঘটে। স্খলিত এ মানবগুলোই প্রকারান্তরে সমাজের জঞ্জালে পরিণত হয়, ওরা সভ্য সমাজের আবার সভ্য বাসিন্দা। মূঢ় দিয়ে সমাজ বিচার্য নয়। মূঢ়তো মূঢ়ই, ওরা মূঢ় বলে এমনিতেই জীবন্মৃত। কিন্তু সভ্যরাতো মূঢ় বিচার্যে আসে না।
১০.
আমি বুঝিনা। অনেক কিছুই বুঝিনা। দূর্যোধন কর্তৃক দৌপদীর বস্ত্রহরণ, আমি বুঝিনা। তনুর আত্মা সেনা কড়া নিরাপত্তায় কেন কাঁদে বুঝিনা। সেবার নামে ফাঁকা বুলি আমি বুঝিনা, যেমনটি রাই বিনোদিনীর প্রেম আমি বুঝিনা। তাহলে আয়ানের অবস্থানে আমার মতবাদ কী? সেটাও বুঝিনা। তবে বুঝিটা কী? শুধুই কী টাকার অংকের সমষ্টিই জীবন! তাহলে আমি টাকশাল স্থাপনের পারমিশনের আবেদন করতেই পারি। করলে সেটাতো দোষের হবার কথা নয়!
১১.
বিজ্ঞজন কহেন,”সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস,আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ” যদি উহা সত্যই ধরে নেই তাহলে সাধুকে বুঝিয়া শিষ্য হওয়া উচিত নচেৎ সর্বনাশ কোলে চেঁপে বসে। তোমার ভুলের মাশুল তোমাকেই দিতে হবে তবে অনেক সময় ভুলকেই শুদ্ধ বলে মনে হয়। যাদের বিচার শক্তির প্রখরতা নেই তারা এ বিষয়টায় বোধগম্যহীন, এটাই আশু বিপদ সম্ভাবনার মূল কারন।
এর মাশূল দিতে হয় জীবনভর।
————————————-
লেখক পরিচিতিঃ একাধিক কাব্য গ্রন্থ প্রণেতা, কবি ও সুলেখক নীরেশচন্দ্র রায় দিরাই পৌর সদরের দোওজের বাসিন্দা, পেশায় শিক্ষক (হাতিয়া সরকারি প্রাথকমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক)
মিস ফায়ার—২৩.১০.২০১৮ খ্রিস্টাব্দ।
[চলবে—]

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :214 বার!

error: Content is protected !!
JS security