এমপি রতনের ‘হাওর বাংলা’

স্থানীয় রাজনীতিতে একসময় নামটি ছিল অচেনা। ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগ কোথাও ছিটেফোটা গন্ধ ছিলনা এই নামের। সময়ের পরিক্রমায় সেই ব্যক্তি এখন শুধু রাজনীতিবিদই নন, জেলার অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। আওয়ামী লীগের টিকেটে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সব হিসেব পাল্টে যায় এই ব্যক্তির। একেই বলে চাঁন কপাল। চাঁনকপালী এই এমপির নাম নন মোয়াজ্জেম হোসেন (রতন)। সুনামগঞ্জ-১ আসনের (ধরমপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ) সংসদ সদস্য তিনি।

নিজ গ্রামের বাড়ি ধর্মপাশা উপজেলার নওধার। গ্রামের বাড়িতে ছিল একসময় টিনশেডের বাসা। সময় পাল্টেছে। সংসদ সদস্য হওয়ার পর পরই হাতে উঠে আসে আলাদীনের চেরাগ। এখন টিনশেডের স্থানে শোভা পাচ্ছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা। শুধু কি নিজ গ্রামে ? না, তা নয় ! তাতে কি আর সংসদ সদস্য হিসেবে নিজের প্রেষ্টিজ থাকে ? জেলাশহর, উপজেলা, রাজধানী এমনটি দেশের বাহিরেও এখন বাড়ি রয়েছে মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের।  

হাওর রাজ্যের মানুষ হিসেবে হাওরের প্রতি বিশেষ টান রয়েছে এই সংসদ সদস্যের। অবশ্য এই টান শেকড়ের নয়, দখলের। রতনের অনুসারীরা তাই হাওর রাজ্যের ‘রাজা’ বলেও সম্মোধন করে থাকেন। সত্যিকার অর্থেই এখন হাওরের রাজা তিনি। হাওরপাড়ের প্রজাদের জমি-জমা মুহুর্তেই চলে আসে রাজার হাতে। রাজার কথাই এখানে শেষ কথা ! প্রজাদের জমি দিয়েই রাজা পূরণ করলেন হাওরের ষোলোকলা। জমিতেই তৈরি হলো রাজপ্রাসাদ। প্রসাদের নাম ‘হাওর বাংলা’।

নিজ গ্রামের বাড়ি ধর্মপাশা উপজেলায় নওধারে গড়ে তোলা হয়েছে এই আলোচিত ‘হাওর বাংলা’। বাড়িটি যেখানে নির্মিত হয়েছে, সেখানে ওই এলাকার দুই ব্যক্তির ৬২ শতাংশ জমি রয়েছে। জমির কোনো দাম পরিশোধ না করেই সীমানাপ্রাচীর দিয়ে জায়গা ঘিরে নিয়েছেন এই আইনপ্রণেতা। অভিযোগ জায়গার প্রকতৃ মালিকদের।

ওই বাড়ির সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে গাছতলা গ্রামের বাসিন্দা আলতু মিয়ার ৩২ শতক এবং পাইকুরাটি গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ রঞ্জন সরকারের ৩০ শতক জমি আছে। স্থানীয়রা জানান, মোয়াজ্জেম হোসেন এখানে প্রথম একটি টিনশেড ঘর করেন। ২০০১ সালে সাংসদ মোয়াজ্জেম তাঁর এক বোনের জন্য একটি ঘর করে দেওয়ার কথা বলে প্রথমে ৮ শতক জমি আলতু মিয়ার কাছ থেকে কিনতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার সময় ৩০ হাজার টাকা দেবেন। কিন্তু টাকা দিই-দিচ্ছি করে আর দেননি তিনি। সাংসদ হওয়ার পর একটি সীমানাপ্রাচীর দেন। আর এতে আলতু মিয়ার বাকি ২৪ শতাংশ জমিও সীমানাপ্রাচীরের ভেতর ঢুকে যায়।
বিষয়টি স্বীকার করেছেন আলতু মিয়া। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাই নতুন করে কি বলবো। গ্রামের সবাই বিষয়টি জানে। কিন্তু আমি তো নিরীহ মানুষ। আমার কথা শুনবে কে ? ’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভুয়া দলিল তৈরি করে এসব জমি নামজারি করে নেন সাংসদের লোকজন। ২০০৮ সালে মামলা করলে আদালত রায়ে ওই নামজারি বাতিল করে দেন।’

আলতু মিয়া জানান, পাইকুরাটি মৌজার ৫১৮ খতিয়ানের ১৭৪৯ দাগে তাঁর ৩২ শতক জমি আছে। আবার মূল ফটকের সামনে সড়কের পশ্চিম পাশে একই মৌজার একই খতিয়ানের ১৫৬০ দাগে আছে আরও ১৭ শতক। এই জমিও দখল করে নেওয়া হয়েছে। সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে উত্তর দিকের অংশ ২০০১ সালে একটি ঘর নির্মাণের জন্য মোয়াজ্জেম হোসেন প্রথম তাঁর কাছ থেকে ৮ শতক জমি কিনতে চেয়েছিলেন।

‘হাওর বাংলা’র ভেতরে বিকাশ রঞ্জন সরকারেরও জমি রয়েছে। পেশায় ব্যাংকার বিকাশ রঞ্জন এখন বসবাস করেন ধরমপাশা উপজেলা সদরে। জানা গেছে বিকাশ রঞ্জনের জায়গার দাগ নম্বর ১৭৫১। এ ছাড়া সাংসদের দুই ভাইয়ের নামে আরও ২ একর ৬৫ শতক জমি তিনি দলিল করে দিয়েছেন। কিন্তু কোনো টাকা পাননি বিকাশ সরকার। অবশ্য এ বিষয়ে বিকাশ রঞ্জনের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি প্রতিবেদকের ফোন রিসিভ করেননি।

জানাগেছে, অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক এই সংসদ সদস্য বিদেশেও টাকা পাচার করেন। যা নিয়ে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হওয়া আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমসহ প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য থেকে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, শতকোটি টাকা অবৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তখন সাংসদ মোয়াজ্জেমকে দুদকে তলবও করা হয়েছিল।অভিযোগের সত্যতা জানতে চেয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন রতনকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি প্রতিবেদকের ফোন রিসিভ করেননি।

জানাগেছে, সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনে সম্পদের হিসাব বিবরণী হলফনামার মাধ্যমে জমা দেন। তাতে দেখা যায়, তখন সাংসদের নামে কোনো বাড়ি ছিল না। কৃষিজমি ছিল ৩ দশমিক ৯৩ একর। অকৃষিজমি ১ দশমিক ১৫ একর।

১০ বছর পর ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় হলফনামার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে আবার একটি হিসাব বিবরণী জমা দেন। সেখানে দেখা যায় সাংসদের কৃষিজমি বেড়ে হয়েছে ৫২৩ একর, অকৃষিজমির পরিমাণ এখন ৮ দশমিক ২৬ একর। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে দুটি দালান, একটি টিনশেড ঘর। এ ছাড়া ঢাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। সাংসদের আছে একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার ও একটি টয়োটা সিডান কার।
সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনে সম্পদের হিসাব বিবরণী হলফনামার মাধ্যমে জমা দেন। তাতে দেখা যায়, তখন সাংসদের নামে কোনো বাড়ি ছিল না। কৃষিজমি ছিল ৩ দশমিক ৯৩ একর। অকৃষিজমি ১ দশমিক ১৫ একর।

হাওরে খুনের ঘটনাও ঘটে সংসদ সদস্যের ইশারায়-এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। বিষয়টি স্বীকার করেছেন খোদ দলীয় নেতাকর্মীরাও। গত ৭ জানুয়ারি সুনই নদ জলমহালে হত্যাকাণ্ড ঘটে। এতে মৎস্যজীবী শ্যামাচরণ বর্মণ (৬৫) নিহত হন। আহত হন আরও ১৫ থেকে ২০ জন। ঘটনার পর নিহত ব্যক্তির ছেলে চন্দন বর্মণ (৩০) সাংসদ মোয়াজ্জেম ও তাঁর ছোট ভাই মোজাম্মেল, বড় ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মোবারক হোসেন ওরফে মাসুদকে আসামি করে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। যদিও সাংসদের নাম থাকায় পুলিশ সেই মামলা নেয়নি।

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :62 বার!

JS security