বাংলাদেশ করোনার ‘ভয়ঙ্কর রূপ’ দেখবে মে মাসেই

ঢাকা সংবাদদাতা: দেশে প্রতিদিনই করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। টানা ছয় সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ শনাক্ত ও মৃত্যুর দৈনিক সংখ্যা বাড়ছে। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হারও বাড়ছে। দেশে এই সংক্রমণ শনাক্তের হারের বর্তমান প্রবণতার ভিত্তিতে সিয়াটলভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই) এ প্রক্ষেপণ বলছে, বর্তমান এই ধারা অব্যাহত থাকলে আরো ‘ভয়ঙ্কর রূপ’ ধারণ করতে পারে করেনা। সেক্ষেত্রে সংক্রমণ পরিস্থিতি চূড়ায় ওঠতে সময় নিতে পারে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

করোনা সংক্রমণের বর্তমান গতিপ্রকৃতি দেশে স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মারাত্মক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) ৭৪ জনের করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এটাই ২৪ ঘণ্টায় দেশে মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড।

অন্যদিকে গতকাল সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৮৫৪ জনের। এই সময় নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। প্রতিদিনই এসব সংখ্যার কোনো না কোনটিতে নতুন রেকর্ড হচ্ছে।

আইএইচএমই’র প্রক্ষেপণে বলা হয়েছে, কোনো ব্যবস্থা নেয়া না হলে মে মাসের মাঝামাঝি নাগাদ দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা দেড় লাখে ওঠে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। সেক্ষেত্রে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়াবে ৮০০-তে।

তবে আইএইচএমই’র এই প্রক্ষেপণ অতিরঞ্জন বলে মনে করছেন দেশের জনস্বাস্থ্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আইএইচএমই’র এ প্রক্ষেপণ অতিরঞ্জন। কিন্তু অতিরঞ্জন থাকলেও তা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এবিষয়ে সরকার গঠিত করোনা প্রতিরোধে জাতীয় কারিগরি পরিমর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আইএইচএমই’র প্রক্ষেপণ যে একদম ভুল, তা বলা যাবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওদের ধারণা ঠিকই রয়েছে। আমরা যদি এখনই কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারি তাহলে এমনটি হওয়া অবাস্তব নয়।

তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ও যন্ত্রাংশের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করতে হবে। জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে হবে। আজকে লকডাউন আর কালকে সীমিত, এমনটি করলে কোনো লাভ হবে না।

আইএইচএমই মনে করছে, মে মাসের মাঝামাঝি সংক্রমণ চূড়ায় ওঠার পর দেশের হাসপাতালগুলোয় শুধু করোনা রোগীর জন্যই সাধারণ শয্যার প্রয়োজন পড়বে ৭৪ হাজার। এর মধ্যে আইসিইউ শয্যার প্রয়োজন হবে সাত হাজারের মতো। ভেন্টিলেটরের দরকার হবে ১৭ হাজারের কাছাকাছি।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে সাধারণ শয্যা রয়েছে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার। এসব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ৬০০। এছাড়া সারা দেশে করোনা রোগীদের অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে ১৪ হাজার ৫৯৩টি, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ১ হাজার ২২টি ও অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ৮৯৭টি।

এবিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মানা ও টিকা নেয়ার বিকল্প নেই। আমরা যদি ৭০-৮০ শতাংশ মানুষও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি তাহলে নিশ্চিতভাবে করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণ সামাল দিতে পারব। টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হবে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আইএইচএমই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়েই এমন প্রক্ষেপণ করেছে। এসব সংস্থা বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে এমন মন্তব্য করে, যাতে সেসব দেশ সাবধান হয়। বেশ কয়েকটি বিষয়ের সরলরৈখিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এমন প্রক্ষেপণ করা হয়। তবে পরিস্থিতি কিন্তু এমন থাকে না। সংশ্লিষ্ট মহল সাবধানতা অবলম্বন করে ব্যবস্থা নিলে অবস্থার উন্নতি হয়।

আইইডিসিআরের বর্তমান প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, আগেও এমন অনেক প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অনেকগুলো শর্ত বিবেচনা করে এমন প্রক্ষেপণ করা হয়। এটা করা হয় সাবধানতার জন্য। আপনি যদি সেবা না বাড়ান ও যথাযথ ব্যবস্থা না নেন তাহলে এমনটি হতে পারে। কিন্তু কেউ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বসে থাকে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও পরিচালক (অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, এসব মডেল করা হয় গাণিতিক বা জ্যামিতিক হারে। এমন প্রক্ষেপণের যে খুব বেশি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন আছে এমন নয়। এক্ষেত্রে যদি কোনো ব্যবস্থা নেয়া না হয় তাহলে এমনটি হতে পারে বলে এসব পরিসংখ্যান দেয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিয়ে বসে থাকে না। মানুষ যদি সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে তাহলে এমনটি হবে না। আর সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবেই। সূত্র: বণিক বার্তা

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :59 বার!

JS security