মাওলানা সৈয়দ আব্দুল আউয়াল বড়হুজুর সত্যই একজন বড় মানুষ ছিলেন! ————সৈয়দ মবনু

লেখক সৈয়দ মবনু:– 

আমাদের গ্রামের বাড়ি সৈয়দপুর অনেকদিন পর যাওয়া হলো। উপলক্ষ ছিলো মাওলানা সৈয়দ আব্দুল আউয়াল বড়হুজুরের জানাজা। ৫ জুন ২০২০ খ্রিস্টাব্দ শুক্রবার তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এইদিনই বিকাল সাড়ে পাঁচটায় সৈয়দপুর হাফিজিয়া হোসাইনিয়া আরবিয়া টাইটেল মাদাসা সংলগ্ন ঈদগাহে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
আমি আর আমার চাচাতো ভাই হাফিজ সৈয়দ তসলিম আহমদ এক সাথে বিকাল তিনটায় জানাজার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে রেব হই এবং আসরের নামাজের সময় গিয়ে সৈয়দপুর পৌঁছি। এখনও ভবের বাজার রোড সুস্থ্য হয়নি বলে গোয়ালাবাজার রোড দিয়ে যেতে হয়। গোয়ালাবাজার রোডও খুব ভালো তা বলা যাবে না। করোনার লকডাউনের কারণে অনেক মানুষই জানাজায় যাননি। এরপরও ঈদগাহ ভর্তি মানুষ ছিলেন। তিনি আমার শিক্ষক ছাড়াও খুব ঘণিষ্ট আত্মীয়। আত্মীয়তা তো সৈয়দপুরে আমরা সবাই সবার। তাই সৈয়দপুরের মূল আত্মীয়তা হয়ে থাকে যাওয়া-আসা, খোঁজ-খবর রাখা এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানাদিতে দাওয়াত করার ভিত্তিতে। মাওলানা সৈয়দ আব্দুল আউয়াল বড়হুজুরের পরিবারের সাথে আমাদের এই গভীর সম্পর্ক ছিলো। আমার বাবার সাথে তাঁর মামা-ভাগিনার সম্পর্ক। আমার দাদির নানি আর তাঁর নানি আপন দু বোন। এ সম্পর্ক উচ্চারণে বেশ দূর মনে হলেও ছোটবেলা থেকেই আমার বাবার সাথে তাঁর মামা-ভাগিনায় বন্ধুত্ব ছিলো। তিনি বয়সে আমার বাবা থেকে দুতিন বছরের বড়। আমার বাবা ও তিনি সৈয়দপুর হাফিজিয়া হোসাইনিয়া আরবিয়া মাদাসার প্রথমদিকের ছাত্র। তখন এই মাদরাসা ছিলো খালিফায়ে মাদানী শায়েখ মাওলানা সৈয়দ আব্দুল খালিক (র.)-এর বাড়ীতে। মাওলানা আব্দুল আউয়াল বড়হুজুর এই মাদরাসায় কোরআন এবং প্রাথমিক কিতাবসমূহ শেষ করেন হাফিজ সৈয়দ আফতাব আলী (র.)-এর কাছে। অতঃপর তিনি ছাফেলা আউয়াল থেকে টাইটেল পর্যন্ত পড়েন ঢাকা উত্তর রানাপিং-এ আল্লামা শায়েখ রিয়াসত আলী শায়খে চৌঘরি (র.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জামেয়া হোসেনিয়া মাদরাসায়।
তিনি টাইটেল শেষ করেন ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে। ছাত্রজীবনে মাওলানা আব্দুল আউয়াল খুব মেধাবী ছিলেন বলে তাঁর সহপাঠিরা বলেছেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু জগন্নাথপুরের কাতিয়া মাদরাসা থেকে। সেখানে ছ’মাস শিক্ষকতা করেন। পরে চলে যান গোলাপগঞ্জের বারকুট মাদরাসায়। সেখানে এক বছর ছিলেন। এরপর হাজীপুর মাদরাসায় তিন বছর। অতঃপর চলে আসেন সৈয়দপুর শামসিয়া সরকারি আলিয়া মাদরাসায়। এখানে চার বছর শিক্ষকতা করেন। এই সময় আমার মা বেগম ফৌজিয়া কামাল এবং বড়মামা ফরীদ আহমদ রেজা ও মেঝমামা আহমদ কুতুব তাঁর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। অতঃপর মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে আবার কাতিয়া মাদরাসায় নিয়ে গেলেন মাওলানা আমিন উদ্দিন শায়খে কাতিয়া (র.)। সেখানে এক বছর থাকেন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি চলে আসেন সৈয়দপুর হাফিজিয়া হোসাইনিয়া মাদরাসায়। ২০১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৪৬ বছর তিনি এই মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে আমি কিছুদিন সৈয়দপুর মাদরাসায় পড়লে আমার সৌভাগ্য হয় তাঁর ছাত্র হওয়ার। আমার জীবনে অসংখ্য আলেম-উলামা, পির-মাশায়েখের সহবতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। ওদের মধ্যে আমি যাদেরকে অত্যন্ত শরিফ বলে অভিজ্ঞতার আলোকে জানতে পেরেছি তাদের অন্যতম একজন মাওলানা আব্দুল আউয়াল বড়হুজুর। আমি তাঁর ছাত্র হয়ে দেখেছি ছাত্রদের প্রতি তাঁর স্নেহ-মমতা কত গভীরে।
তিনি সবসময় ছাত্রদের সাথে নরম ভাষায় কথা বলতেন, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তাঁর ছিলো জামালি তবিয়ত। তিনি সবসময় একটু মুচকি হেসে কথা বলতেন। তাঁকে আমি আত্মীয় হিসাবে দেখেছি, তিনি আত্মীয়তার সূত্র ধরে সম্পর্ককে আরও গভীরে নিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন। তিনি আলোচনায় পুরতান কথাগুলোকে উল্লেখ করে অনেক লজ্জতপূর্ণ নসিহত তৈরি করতেন। তিনি কথার ফাঁকে তাঁর মুরুব্বীদের স্মরণ করে বিভিন্ন বিষয় বর্ণনা করতেন। তাঁর কাছ থেকে আমি আমার দাদাজীর বিভিন্ন বিষয় অবগত হয়েছি। যারমধ্যে উল্লেখযোগ্য, সৈয়দপুর তথা জগন্নাথপুর অঞ্চলে সর্বপ্রথম আলেমদেরকে বাহির থেকে এনে মাহফিল করে ওয়াজ করানোর রুসুম চালু করেছিলেন আমার দাদা হাজী সৈয়দ শমসাদ আলী। বড়হুজুর তখন বেশ ছোট ছিলেন। তবু অনেক কথা এবং ওয়াজ তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত স্মরণ ছিলো । তিনি আমাকে বলেছেন, ‘তোমাদের পুরানবাড়িতে সেই সময় তোমার দাদা ওয়াজের আয়োজন করতেন। তখন তাঁর দুই আড়াইশ মন ধান হতো। তিনি তাঁর নিজের টাকা দিয়ে আলেম এনে ওয়াজ করাতেন। আমি ছোট ছিলাম, তবে ওয়াজে যাওয়া হতো। অনেক ওয়াজ এখনও আমার স্মরণ আছে। অতঃপর এই ওয়াজ করানোর প্রথা সৈয়দপুর গ্রামে চালু হয়। তোমার বাবাও এই প্রথা চালু রেখেছেন। আশা করি তুমিও রাখবে।
মাওলানা আব্দুল আউয়াল বড়হুজুর এবং আমাদের পরিবার মূলত হযরত শাহজালাল ইয়ামনি (র.)-এর সফরসঙ্গি হযরত শাহ সৈয়দ শামসুদ্দিন (র.)-এর বংশধর। বংশের দিকে হযরত রাসুল (র.) থেকে সৈয়দ শাহ শামসুদ্দিন (র.) হয়ে সৈয়দ জিবরিল (র.) পর্যন্ত আমরা একই ধারায় আছি। অতঃপর বংশেল ধারা দুদিকে চলে যায়। আমরা সৈয়দ আব্দুল্লাহ হয়ে মারুফ-মুনায়েম তালুকে আর মাওলানা আব্দুল আউয়াল বড়হুজুর (র.) সৈয়দ আহমদ হয়ে উজিয়াল চান্দ তালুকে চলে যান। মাওলানা আব্দুল আউয়াল বড়হুজুরের জন্ম ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগষ্ট।
তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম সৈয়দ আব্দুল মান্নান, মা মরহুমা সৈয়দা আসিয়া বেগম। তাঁর নসবনামা হলো, সৈয়দ আব্দুল আউয়াল বিন সৈয়দ আব্দুল মান্নান বিন সৈয়দ আলা উদ্দিন বিন সৈয়দ বাহা উদ্দিন বিন সৈয়দ মাহতাব উদ্দিন বিন সৈয়দ আফতাব উদ্দিন বিন সৈয়দ বখতিয়ার উদ্দিন বিন সৈয়দ দাউদ উদ্দিন বিন সৈয়দ বদরুদ্দিন বিন সৈয়দ আহমদ উদ্দিন বিন সৈয়দ জবরিল উদ্দিন বিন সৈয়দ মুখতার উদ্দিন বিন সৈয়দ আব্দুল্লাহ বিন সৈয়দ শাহ আহমদ বিন সৈয়দ শাহ হুসাইন বিন সৈয়দ শাহ শামসুদ্দিন বিন সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন বিন সৈয়দ শাহ মাহমুদ বিন সৈয়দ শাহ কুতুবুদ্দিন বিন সৈয়দ শাহ আব্দুল্লাহ বিন সৈয়দ শাহ শরফুদ্দিন বিন সৈয়দ শাহ আব্দুল ওয়াহিদ বিন সৈয়দ শাহ আব্দুল হাই বিন সৈয়দ শাহ নিজাম উদ্দিন বিন সৈয়দ শাহ দাউদ উদ্দিন বিন সৈয়দ শাহ হারুন বিন সৈয়দ শাহ খলিলউল্লাহ বিন সৈয়দ শাহ জাফর আলী বিন সৈয়দ ইমাম মুছা কাযিম বিন সৈয়দ ইমাম জাফর সাদিক বিন সৈয়দ ইমাম বাকির বিন সৈয়দ ইমাম যয়নুল আবেদীন বিন সৈয়দ ইমাম হোসাইন বিন সৈয়িদাতুন নিসা হযরতে ফাতিমা বিনতে হযরত মোহাম্মদ (স.)।
মাওলানা সৈয়দ আব্দুল আউয়াল বড়হুজুরের ছয় ছেলে এবং সাত মেয়ে। তিনি একজন প্রচারবিমূখ, পদলোভহীন মানুষ ছিলেন। তাঁকে মাদরাসার মুহতামিম হতে অনুরোধ করা হয়েছিলো, তিনি তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখান করেছিলেন। সাধারণত কোন মাদরাসার মুহতামিম বা প্রিন্সিপাল হলে মানুষ তাঁকে বড়হুজুর ডাকে। কিন্তু মাওলানা আব্দুল আউয়াল ‘বড়হুজুর’ হওয়ার একটি শানে নুজুল আছে। বিভিন্নসূত্রে জানা যায়, জগন্নাথপুরের পাটলি গ্রামের মাওলানা আসগর হোসাইন হলেন মাওলানা আব্দুল আউয়াল সাহেবের ছাত্র। আসগর হোসাইন সাহেবের ছাত্ররা তাঁকে হুজুর এবং তাঁর হুজুরকে ‘বড়হুজুর’ ডাকতো। এই থেকে তিনি ‘বড়হুজুর’ উপনামে পরিচিতি লাভ করেন।
‘বড়হুজুর’ উপনাম এক সময় এতই প্রসিদ্ধ হলো যে অনেকে তাঁর মূল নাম পর্যন্ত ভুলে গেলো।  তিনি যেমন উপাধীতে বড়হুজুর ছিলেন তেমনি ব্যবহারেও বড় ছিলেন। ফালতুকথা মোটেই বলতেন না, যা তাঁকে করেছিলো খুব সম্মানি। গ্রামের মানুষদের সালিশ-পাঞ্চায়িতে তাঁর রায়কে মুরুব্বীরা সবসময় অগ্রাধিকার দিতেন। পারিবারিক বা গোষ্ঠিগত সংঘাতে তিনি জড়াতেন না। তাঁকে দেখলেই মনে হতো তিনি অত্যন্ত আল্লাহভীরু, মুত্তাকী, পরহেজগার একজন মানুষ। তাঁর মধ্যে নবীওয়লা জীবন স্পষ্ট ছিলো। সবসময় তাঁর আল্লাহওয়ালাদের সাথে সম্পর্ক ছিল। তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আল্লাহর উপর ভরসা করে চলতেন। দীর্ঘদিন তিনি বয়সের কারণে অসুস্থ্য ছিলেন। অতঃপর তিনি ৫ জুন ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ফজরের পর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। আল্লাহ তাঁকে পরকালে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :126 বার!

JS security