সিলেটে ‘ফুরির বাড়ি ইফতারি’ প্রথা,

সিলেট অঞ্চলের নিয়মানুযায়ী ফুরির বাড়ি (মেয়ের শ্বশুরবাড়ি) ইফতারি এ যেন এক আতঙ্কের নাম। অতিথি আপ্যায়নে সিলেটের মানুষের রয়েছে দারুণ সুখ্যাতি। বিশেষ করে সিলেটের আপন ঐতিহ্য-রমজান মাসে মেয়েরে শ্বশুরবাড়িতে ইফতারি নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের ভাষায় এটাকে ‘ফুরির বাড়ি ইফতারি’ বলা হয়। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সিলেট অঞ্চল থেকে ফুরির বাড়ির ইফতারি দেয়ার রেওয়াজে পরিবর্তন চলে এসেছে। আগেকার সময়ে রমজান মাস এলে নিজ বাড়িতে বানানো ইফতারি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যেতেন তার অভিভাবকেরা। কিন্তু আগের মতো বাড়িতে বানানো ইফতারি আর মেয়ের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় না। এখন সে স্থান দখল করে নিয়েছে হাটবাজারে বানানো বিভিন্ন পদের ইফতারি। এটি ধনীদের কাছে দারুণ ব্যাপার হলেও অসহায় গরিব মানুষের কাছে “ফুরির বাড়ির ইফতারি” যেন আতঙ্কের নাম ।

শিক্ষিত বা অশিক্ষিত জাতির মাঝে কোন পার্থক্য এই ইফতারির ক্ষেত্রে নেই। কিন্তু আমাদের চোখের সামনেই চলছে এটা অবিরত। আমরা গ্রহণ করছি খুব সহজেই। কেউ দিচ্ছি আর কেউ নিচ্ছি। আমাদের সবার মধ্য থেকে এই ইফতারি কে ঘৃণার চোখে দেখতে হবে। তাহলেই সব সম্ভব, পরিবর্তন হয়ে যাবে সমাজ।

একবার কি ভেবে দেখেছি, এই ইফতারি দিতে কনের গরিব পিতার-মাতার উপর কি পরিমাণ চাপ যাচ্ছে। একেকটি ইফতারি দিতে নূন্যতম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মিষ্টি-মাষ্টি লাগে। পিতার পাঁচ কন্যা থাকলে সকলের বাড়িতে ইফতারি দিতে কি যে অসুবিধায় পড়তে হয়, তা কি চিন্তা করেছেন। আপনি জানেন কি এই ইফতারি দিতে কেউ কেউ ঘরের গরু-ছাগল বিক্রি করে। কেউ ধার-কর্জ করে। বর্তমানে ইফতারি যেন ‘ফরজ’ হয়ে আছে।

কানাইঘাটের পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের লতিফ মিয়া পেশায় একজন ছোটখাটো ব্যবসায়ী। তার স্ত্রীর আবদার মেয়ের বাড়িতে ‘পহেলা ইফতারি’ ঘটা করে পাঠাতে হবে। তবে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠাতে হবে যতই হোক মেয়ের মুখ উজ্জ্বল করতে এই সামাজিক প্রথা মানতে হবে ।

লতিফ মিয়ার মতো মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠানোর প্রথা রক্ষা করতে গিয়ে কানাইঘাটের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে নানাভাবে হিমশিমের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। কানাইঘাটের অনেক পরিবারের কাছে মেয়ের বাড়িতে (ফুড়ির বাড়ি) ইফতারি দেওয়ার প্রথা ঐতিহ্য মনে হলেও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এ যেন এক আতঙ্কের নাম।

রমজানের কানাইঘাটের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখেন এ প্রতিবেধক, এতে বেশ কয়েকজনের সাথে ইফতারি নিয়ে আলোচনা করেন। ইফতারি কিনতে আসা এবাদুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমার “তিনটি মেয়ে” প্রতিবছরই আমার মেয়েদের বাড়িতে ইফতার পাঠাতে হয় । কেন ইফতারি দেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাবারে এটা এখন একটা স্টাইল হয়ে দাড়িয়েছে । যদি ইফতারি না পাঠাই তবে মেয়েগুলোর মুখ ছোট হয়ে যাবে। কানাইঘাট বাজারের ভাই ভাই রেষ্টুরেন্ট, দিবা রাত্রি রেষ্টুরেন্টের সামনে লাইন ধরে মিষ্টি, জিলাপি, সাদা নিমকি কিনতেছেন অনেক ক্রেতা । যাহা ইফতারি হিসাবে যার যার মেয়েদের বাড়িতে পাঠাবেন। মাধ্যম হিসাবে কেউ সিএনজি কেউ আবার নোহা রিজার্ভ করে ইফতারি নিয়ে মেয়ের বাড়িতে যাবেন। এমনি একজন সদর ইউপি গোসাইনপুর গ্রামের আলমগির হোসাইন চেহারা মলিন করে ইফতারি কিনতেছেন। কাছে ঘেষে তার অনুভূতি জানতে চাইল তার সদুত্তর জবাব, আমি হয়ত নিঃস্ব হয়ে যাব। একদিকে করোনাভাইরাসে আমার সব ব্যবসা বন্ধ। তার উপর মেয়েদের বাড়িতে ইফতারি। এ যেন ‘মরার উপর খারার ঘা’ তবে আত্মসম্মান রক্ষার্থে ইফতারি দিতেই হবে ।

প্রতি বছর রমজান মাসে কানাইঘাটে শুরু হয়ে যায় মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠানোর ধুম। বিত্তবানদের কাছে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠানো অনেকটা আনন্দের মনে হলেও চরম বিপাকে পড়তে হয় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। ফলে কানাইঘাটের দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে ইফতারি পাঠানোর প্রথা এখন আতঙ্কের আরেক নাম। এদিকে কানাইঘাটের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিভিন্ন সময়ে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে “ফুরির বাড়ি ইফতারি” নামক প্রথা থেকে বের হয়ে আসতে আহবান জানিয়ে আসতেছে। তবে কিছুতে প্রতিকার মিলছেনা। সমাজের সচেতন মানুষেরা মনে করেন যদি প্রতিটি গ্রাম, ইউপি, পরিবারের মধ্যে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনা করা যায় তবে এটা প্রতিকার সম্ভব ।

....সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করুন

মন্তব্য

সংবাদটি পড়া হয়েছে :82 বার!

JS security